মাহতাব চৌধুরী, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ঘোষিত ২০২৬ সালের ডিনস অ্যাওয়ার্ড ও ভাইস-চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন তালিকা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীন ছয়টি বিভাগ থেকে কোনো শিক্ষক ডিনস অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন না পাওয়ায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেলের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের চারটি ক্যাটাগরিতেই মনোনয়ন পেয়েছেন কেবল তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা (আইআইএস) বিভাগের শিক্ষক মো. আতীকুজ্জামান। তিনি ‘বেস্ট রিসার্চার’, ‘মোস্ট প্রোডাক্টিভ রিসার্চার’, ‘হাইয়েস্ট পাবলিশিং স্কলার’ এবং ‘রিসার্চ কন্ট্রিবিউটিং’ এই চারটি ক্যাটাগরিতেই মনোনীত হয়েছেন।
অন্যদিকে একই অনুষদের অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষকই মনোনয়ন পাননি। এ নিয়ে গবেষণা মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ।
মনোনয়ন তালিকা অনুযায়ী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে আইসিই বিভাগের অধ্যাপক ড. অপূর্ব অধিকারী ‘বেস্ট রিসার্চার’ ও ‘মোস্ট প্রোডাক্টিভ রিসার্চার’ ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়েছেন। এসিসিই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম ‘রিসার্চ কন্ট্রিবিউটিং অ্যাওয়ার্ড’ এবং ইইই বিভাগের ড. এস এম সোহেল রানা দুটি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছেন।বিজ্ঞান অনুষদে ওশেনোগ্রাফি বিভাগের ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন সিদ্দিকী একাই চারটি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছেন। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের জাকিউল ইসলাম ও পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের নিগার সুলতানাও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়েছেন।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ, এমআইএস বিভাগের মো. শাহরিয়ার সেতু এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তানভীর আহমেদ মনোনয়ন পেয়েছেন। জীববিজ্ঞান অনুষদে ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশন সায়েন্স বিভাগের ড. তৌহিদ হাসান তিনটি ক্যাটাগরিতে, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. শিপন দাস গুপ্ত এবং ফিসারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের ড. শ্যামল কুমার পাল মনোনীত হয়েছেন।
এদিকে ভাইস-চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছেন কৃষি বিভাগের ড. নুসরাত জাহান মিথিলা (বেস্ট ওম্যান রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড), ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড) এবং ওশেনোগ্রাফি বিভাগের ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন সিদ্দিকী (ইয়াং রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড)।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ছয়টি বিভাগের কোনো শিক্ষক কি সত্যিই গবেষণায় অবদান রাখেননি, নাকি মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেই রয়েছে কাঠামোগত বৈষম্য? আইআইএস ইন্সটিটিউটকে সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত করে চারটি মনোনয়ন দেওয়া হলেও অন্য ছয়টি বিভাগ সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়ে ল্যাবকেন্দ্রিক যৌথ গবেষণার মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত ও বেশি সংখ্যক গবেষণাপত্র প্রকাশ সম্ভব। বিপরীতে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাংলা কিংবা ইংরেজির মতো বিষয়ে গবেষণা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি, গুণগত ও একক প্রচেষ্টানির্ভর। ফলে একই মানদণ্ডে সব অনুষদের গবেষণা মূল্যায়ন করা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে।
তাঁদের মতে, অ্যাওয়ার্ডের শর্ত শিথিল করার চেয়ে বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। প্রতিটি অনুষদের নিজস্ব গবেষণা বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে গবেষণা পুরস্কার আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের কয়েকটি ইন্সটিটিউট ডিনস এওয়ার্ড দেওয়ার সময় ফ্যাকাল্টির অন্তর্ভুক্ত করে। আমাদের এখানেও তাই হয়েছে। গত বছর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে ডিনস এওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু এবার ফ্যাকাল্টি অনুসারে আলাদাভাবে। আমরা নীতিমালা অনুসারে শিক্ষকদের যাচাই-বাছাই করেছি। তাদেরকে ১০০ নাম্বারের মধ্যে ইভালুয়েট করা হয়েছে, যেখানে ৪০ এ পাস মার্ক। ৪০ এর উপরে যারা পেয়েছে তাদের মধ্যে যে প্রথম তাকেই নির্বাচন করা হয়েছে। যেহুতু এটা ডিনস এওয়ার্ড তাই সব বিভাগের ক্ষেত্রে একই নীতিমালা প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে যদি এ ব্যাপারে বিবেচনার করার দরকার হয়, আমরা একাডেমিক কাউন্সিলে এ ব্যাপারে আলোচনা করবো। ”
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী বলেন, “এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য কমিটির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ব্যাপারটি ভালো জানেন। তবে এগুলো পূর্বের নিয়মেই হয়েছে। আমার কাছে যেভাবে আনা হয়েছে আমি সেভাবেই সাইন করেছি।”
তিনি আরও বলেন , আমি আগামীতে চেষ্টা করবো আর্টস এবং সোশাল সাইন্সকে দুটি ফ্যাকাল্টিতে রূপ দিতে। যাতে এ ধরনের সমস্যাগুলো না হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের উৎসবমুখর আয়োজনের মধ্যেই ডিনস অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন তালিকা তাই নোবিপ্রবিতে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গবেষণাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত পুরস্কার যদি একটি অনুষদের অধিকাংশ বিভাগকে উপেক্ষা করে হয়, তবে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।